,

‘আমাদের জন্মটা ছিল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য’

ছবি এঁকেছেন : সাবরিনা জাহান সামিহাছবি এঁকেছেন : সাবরিনা জাহান সামিহা

ওয়ারিশ আজাদ নাফি >>

রাজশাহী ভার্সিটির সাইকোলজির শিক্ষক আবদুল কাইয়ুম স্যার ক্লাসে ছাত্রদের যতটা না সাইকোলজি পড়াতেন তার চেয়ে বেশী শুনাতেন নিজের স্বপ্নের কথা
– তোমরা তরুণ। তোমরাই পারবে এ জাতিকে মুক্ত করতে। আমার স্বপ্ন একদিন স্বাধীন বাংলাদেশে আমি ছাত্রদের ক্লাস নেব। পারবে না তোমরা?
স্বপ্নবাজ শিক্ষক আবদুল কাইয়ুম স্যারকে পদ্মার পাড়ে জীবন্ত পুতে দিয়েছিল পাকিরা
.
২৮ শে মার্চ হানাদারদের হাতে শহীদ হওয়ার আগে আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার ছেলে মেয়েদের কাছে ডেকে বলেছিলেন
” আমাকে যদি ওরা মেরে ফেলে, তাহলে তোমরা আমার লাশটা বারান্দায় ফেলে রেখ যাতে বাংলার মানুষ আমার লাশ দেখে সাহস পায়্‍”
.
একদিন এই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই পাকিস্তান পার্লামেন্টে দাড়িয়ে বজ্রকন্ঠে বলেছিলেন
” Out of six crores and ninety lakhs people inhabiting this state, 4 crores and 40 lakhs of people speak Bengali language. for that, sir, I consider that Bengali language is a lingua franca of our state ”
.
পাক হানাদারেরা বাংলার ব্রেভ হার্ট ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের হাটু গুড়িয়ে দিয়েছিল বাটালি দিয়ে, চিমটা দিয়ে উপড়ে নিয়েছিল চোখ। ১৪ ই এপ্রিলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কে হামাগুড়ি দিয়ে বাথরুমে যেতে হত
.


ট্রেনগুলোতে তখন আজকের মত ডিজেল ইঞ্জিন না কয়লার ইঞ্জিন ছিল। পাক হানাদারেরা চব্বিশ ঘন্টা সেই কয় ট্রেনের কয়লার ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রাখতেন। যাতে বাঙ্গালীদের সরাসরি ইঞ্জিনের পাশে কোলরুমে উত্তপ্ত কয়লায় ফেলে হত্যা করা যায়। পাকিদের কাছে বাঙ্গালরা ছিল একটা বুলেটেরও অযোগ্য। সৈয়দপুরের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শামশাদ আলীকে সেদিন পাকিরা কয়লার ইঞ্জিনের উত্তপ্ত কয়লায় ফেলে হত্যা করেছিল
.
ঢাকা মেডিকেলের কার্ডিয়াক স্পেশালিস্ট ডা. ফজলে রাব্বির প্রিয়তমা স্ত্রী ১৪ তারিখ রাতে দুস্বপ্ন স্বামীকে জানালে ডা. ফজলে রাব্বি বলেছিলেন
” তুমি বোধহয় আমার কবর দেখেছ। ”
আলবদেরা ডা. ফজলে রাব্বি কে ধরে নিয়ে যাওয়ার ফজলে রাব্বি স্ত্রীকে বলেছিলেন ” টিকুর আম্মা ওরা আমাকে নিতে এসেছে। ”
১৭ ই ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে যখন ডা. ফজলে রাব্বির লাশ পাওয়া যায় তার দেহটা তখনো তাজা। কার্ডিয়াক ডাক্তার ফজলে রাব্বির হৃদপিন্ডটা বের করে নিয়েছিল হানাদারেরা
.
আগুনের পাখি সেলিনা পারভীন কে যখন আলবদরেরা ধরে নিয়ে যায় মা তখন ছেলে কে গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছেন। ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহের আদরের শ্রদ্ধার পারভীন আপা। ডেকে এনে নিজে রেধে ভাত খাওয়াতেন। হানাদারদারেরা সেলিনা পারভীন কে নিয়ে যাওয়ার আগে ছোট্ট ছেলে সুমনের মাথায় হাত বুলিয়ে মা সেলিনা পারভীন বলেছিলেন
” তুমি মামার সাথে খেয়ে নাও সুমন। মা যাব আর আসব। ”
সুমনের মা আর আসেনি ফিরে। বধ্যভূমিতে সেলিনা পারভীনের বেয়োনেটে ক্ষত বিক্ষত লাশ পাওয়া গিয়েছিল
.
.
মুনির চৌধুরীর জন্য ভাত বেড়ে রেখেছিলেন তার মা। গরম ভাত থেকে মায়ের আদরের ধোয়া উড়ছিল। তার বদলে আল বদরেরা মুনির চৌধুরী কে মৃত্যু উপহার দিয়েছিল।
গল্প আছে ডা. আলিম চৌধুরীর ,শহীদুল্লাহ কায়সারের আরো শত সূর্যসন্তানের্।
.
স্বাধীনতা প্রজন্ম এভাবেই এসেছে।
স্বাধীনতা কোন ফ্যান্টাসি না ডুড। আকাশ থেইকা সুপারম্যান আইসা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে যায় নাই।
যে মাটির বুকে বসে তোমরা দিন রাত হই চই আড্ডা ফুর্তি করছ সে মাটির জন্ম দিতে একজন সেলিনা পারভীন কে বেয়োনেটে ক্ষত বিক্ষত হয় ,একজন মেহেরুননিসার কাটা মুন্ডুকে ফ্যানে ঝুলতে হয় একজন বীর শামশাদ আলীকে কয়লার আগুনে জ্বলতে হয় একজন ফজলে রাব্বিকে হৃদপিন্ড হারাতে হয়।
.
সেই মুনির চৌধুরী ,শহীদুল্লাহ কায়সারদের ভুলে যেওনা প্রজন্ম। আমাদের জন্মটা ছিল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। আমরা শত্রুর হাত থেকে অস্ত্র কাইড়া নিয়া শত্রুর বুকে গুলি করছি।

ওয়ারিশ আজাদ নাফি

ওয়ারিশ আজাদ নাফি

‘ফেসবুক কর্ণার এ প্রকাশিত লেখা প্রয়োজন২৪ এর নিজস্ব প্রতিবেদন নয়, ফেসবুক ব্যাবহার কারীদের মতামত।’

Share Button