,

লাইলাতুল ক্বদর- হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রজনী

tumblr_lqcutsdwzS1qgvpx6o1_1280

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘আমি একে (আল-কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আপনি কি জানেন? হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল ক্বদর’।আমাদের দেশের ছোট-বড় সকল মসজিদে লাইলাতুল ক্বদর মানে ২৬ রমজান দিবাগত রাতকেই বিবেচনা করা হয়। ক্বদরের শব্দের অর্থ হলো মর্যাদা ও মাহাত্ম্য। এ রাতের ইবাদত-বন্দেগী ও রোনাজারীর কারণেই একজন পাপীষ্ঠ নরধম গুনাহগার মানুষও আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে। আল্লাহ পাক বান্দার জীবনের অনেক বিষয়ের ব্যাপারে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সম্পন্ন করান- তার মধ্যে রুটি, রুজি, জীবন-মরণ তথা সারা বছরের ভালো মন্দের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও রয়েছে।

হাদিসে এসেছে :
রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কিরামদের বৈঠকে বনি ইসরাইলের এক আবেদের কথা উল্লেখ করেন যে, তিনি এক হাজার মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আজমাঈন এ কথা শুনে আফসোস করে বলেন, এক হাজার মাস মানেতো তিরাশি বছর চার মাস; কিন্তু এ যুগের অনেকেতো এত জীবন (হায়াৎ) পায় না। তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালামের উম্মতের  মতো এতো অধিক সময়ের ছাওয়াব লাভের সুযোগ ও সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন-এর এ অনুশোচনা ও আফসোসকালীন সময়ে জিব্রিল আমীন আল্লাহর পক্ষ থেকে  কুরআনুল কারিমের এ মর্যাদাসম্পন্ন গুরুত্ববহ সূরা ক্বদর নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সুখবরটি সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈনের নিকট বলেন, “লাইলাতুল ক্বদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর”। অর্থাৎ হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল ক্বদর।

অসংখ্য হাদিসের বর্ণনানুযায়ী রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর রয়েছে। এ রজনীকে কেন গোপন রাখা হল, স্পষ্ট করে কেন বলা হয়নি যে, ওমুক বিজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর। এর মাঝেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অপার রহ্স্য বিদ্যমান। সাধারণত দুনিয়ার জীবনে কোনো কিছু অর্জন করতে চাইলে কত কষ্ট! কত রকম তদবির-বাণিজ্য! কত পেরেশান! সর্বোপরি কত মাস, বছরও পেরিয়ে যায়। কিন্তু মাত্র একটি রাত্রি ইবাদতের ফলে হাজার মাস অর্থাৎ তিরাশি বছর চার মাস! চিন্তা করা যায় আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি কত বড় মেহেরবান!

ভাববার বিষয় :
লাইলাতুল ক্বদরের জন্য রজনী জাগ্রত থাকব? ধরা যাক, যদি বলা হয় রমজানের ত্রিশ রজনী ইবাদত বন্দেগী করলে লাইলাতুল ক্বদর পাওয়া যাবে; তখনকি মুমিন মুসলমান এই ত্রিশ রজনী ইবাদত-বন্দেগী করবে না? ত্রিশ রাত্রির বিনিময়ে প্রায় ৩০৪১৫ (ত্রিশ হাজার চার শত পনের) রাত্রির ইবাদতের ছাওয়া পাওয়া যাবে। এখন ভাবুন তো! কোনো মানুষ যদি দুনিয়ার জীবনে একাধিক পরিমাণ লাইলাতুল ক্বদর পায়; তবে কি উম্মাতে মুহাম্মাদীর আফসোসের  কোনো করণ থাকে পারে? অথচ মানুষ শুধুমাত্র রমজানের ২৬তম দিবাগত রাতেই লাইলাতুল ক্বদর তালাশে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; শুধু কি তাই, ইবাদত-বন্দেগী বাদ দিয়ে নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ লাইলাতুল ক্বদর আল্লাহ তাআলার বিরাট হিকমত ও রহস্য।

ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি দার্শনিকগণ  লাইলাতুল কদরের বিষয়টি গোপনীয় রাখার আরেকটি রহস্য ব্যক্ত করেন এভাবে যে,লাইলাতু ক্বদর যদি নির্দিষ্ট রাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং মানুষ তা জেনে ফেলে; তবে অনেক অলস, অজ্ঞ, দিকহারা হতভাগ্য ব্যক্তি মর্যাদাপূর্ণ মহান রাতের মর্যাদা না দিয়ে আল্লাহর অভিশাপে পতিত হয়ে যাবে। তাইতো আমাদের উচিত শেষ দশকের প্রতি বিজোড় রাত জাগ্রত থেকে কুরআন তিলাওয়াত, তসবীহ-তাহলীল, জিকির-আজকার, নফল নামাজসহ অন্যান্য উত্তম আমলের মাধ্যমে লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত অর্জনের চেষ্টা করা।

হাদিসে বর্ণিত আছে :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, `যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে কিয়াম করে অর্থাৎ ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত্রি জাগরণ করে তার অতীত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তাই লাইলাতুল ক্বদরের ইবাদত মানবজীবনের পাপমুক্তি  ও আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য অপরিসীম কল্যাণকর এক মাধ্যম। তাছাড়া উম্মাহাতুল মু`মেনিন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে যাই তখন কোন দোয়া পড়ব, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফা’ফু আন্নি অর্থাৎ হে আল্লাহ আপনি অবশ্যই ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করাকে পছন্দ করনে, কাজেই আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’।(তিরমিযি)

এছাড়াও লাইলাতুল ক্বদরের ইবাদতের মধ্যে রয়েছে :
ক. নফল নামাজ আদায় করা;
খ. কুরআন তেলাওয়াত করা;
গ. জিকির-আজকার করা তথা তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করা;
ঘ. দরুদ শরীফ বেশি পরিমাণে পড়া এবং
ঙ. অধিক পরিমাণে মুক্ত হস্তে দান-সদকা করা ইত্যাদি।

আসুন আমরা লাইলাতুল ক্বদর তালাশে বাকি রজনীগুলো ইবাদত-বন্দেগীতে কাটিয়ে দিই। লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে হয়ে যাই পৃথিবীর সেরা সৌভাগ্যবান। আল্লাহ আমাদের লাইলাতুল ক্বদর পাওয়ার কিসমত ও তাওফিক দান করুন। আমীন।

Share Button