,

মেয়েটি ক্ষিধের যন্ত্রণায় দুটি রুটি খেয়েছিল তাই…

a542f245740c-ক্ষিধের যন্ত্রণায়

ঘাড়ে গরম খুন্তির ঝলসানো ছেঁকা। গলায় ছুরিকাঘাতের ক্ষতচিহ্ন। মুখমণ্ডলে নখের আঁচড়। বুকে আর পিঠে রক্তাক্ত জখম। চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। মাথার চুলও কেটে দেওয়া হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের একটা কন্যাশিশুর শরীরের এমন বীভৎস রূপ যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।

শুধুমাত্র ক্ষিধের যন্ত্রণায় অনুমতি না নিয়ে দুটো পরোটা খাওয়ার অপরাধে এমন অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আঘাতের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কোনমতে বাসা থেকে পালিয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে শিশুটি। প্রতিবেশী রোকেয়া সুলতানা ও উম্মে হাবিবা নামে দুই মানবাধিকারকর্মী তাকে উদ্ধার করেন। কথিত সিআইডির কর্মচারী সানজিদা আকতার নামে এক গৃহকর্ত্রীর হাতে এ নির্মম নির্যাতনের শিকার হন শিশুটি। গতকাল বিকেল ৩টায় নগরীর সদরঘাট থানার আইসফ্যাক্টরি রোডের এয়াকুব বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় এ ঘটনা ঘটে। খবর আজাদীর। 

নির্যাতিত মেয়েটির নাম স্বপ্না আক্তার মুক্তা। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার ময়নামতি উপজেলার পাইকপাড়া। সে গত আট মাস ধরে ওই বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে শিশুটি পুলিশি হেফাজতে আছে। এ ঘটনায় শিশুটির নিরাপত্তা চেয়ে সদরঘাট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়।



ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সদরঘাট থানার সেকেন্ড অফিসার মোঃ নাজির আলম সাংবাদিকদের জানান, আমরা অভিযোগ পেয়েছি। এখন তদন্ত সাপেক্ষে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। মেয়েটির জন্য যা যা ভালো হয় আমরা তা করার উদ্যোগ নিবো। আঘাতের চিহ্ন দেখে তিনিও বিস্মিত হয়েছেন জানিয়ে বলেন, আমাদের আসলে শিশুদের ব্যাপারে আরো অনেক মানবিক হতে হবে।

সকল শিশুরই নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। গৃহকর্ত্রী সানজিদার অত্যাচারের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুক্তা বলেন, গত সোমবার সকালে ম্যাডামকে না বলে দুটো পরোটা খেয়েছিলাম। ঘটনাটি জানার পর তিনি অনেক মারধর করেন। আমি চুপচাপ ছিলাম। এরপর দেখি সাহেব রাতে আসার পর দু’জন মিলে আমার চুল কেটে দেন। এরপর চুলোর গরম খুন্তি দিয়ে ঘাড়ে ছেঁকা দেন। আমি যন্ত্রণায় বেহুশ হয়ে পড়ি। আর সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বাড়িতে আর না। তাই আজকে (গতকাল) পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। ম্যাডামের হাতে ধরা খেয়ে আবারও জুটলো মারধর। এই যে দেখেন, আমার গলায় ছুরি বসিয়ে আমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছে।

মুক্তা আরো বলেন, একটু ভুল হলেই দুজনই অকথ্য ভাষায় গালাগালের পাশাপাশি চড়থাপ্পড় মারেন। ম্যাডাম একটু এদিক সেদিক হলেই আমাকে চোখ রাঙিয়ে বলতেনযদি বাসার কাজ ঠিকমতো না করিস তবে তোকে পুলিশে দেবো। তুই জানিস, পুলিশ নিয়েই আমার কাজ কারবার। সুতরাং সবকিছু ঠিকঠাক করবি।

এদিকে গৃহকর্ত্রী সানজিদার স্বামী মহসিন মারধরের বিষয়টি স্বীকার করলেও শিশুটির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, আমাদের অনুপস্থিতিতে মুক্তা বাসার স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলো। এ সময় আমার স্ত্রী বাসায় ফেরার পথে তাকে আটক করে রাগের মাথায় আঘাত করেছে। কিন্তু মুক্তাকে আমরা কখনোই আদরযত্নের কমতি করিনি। ওকে সবসময় আমরা মামেয়ে বলে ডাকতাম।

অন্যদিকে নিজেকে সিআইডির কর্মচারী পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সানজিদা বলেন, আমি এসব পরিচয় কাউকে দেইনি। তবে মুক্তাকে নির্যাতনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। শিশুটিকে উদ্ধার করা মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান সৌরভ, জেলা সদস্য রোকেয়া সুলতানা ও উম্মে হাবিবা ঘটনার বিবরণে বলেন, আমরা জানতাম গৃহকর্ত্রী সিআইডির কর্মচারী। সে হিসেবে আমরা উনাকে সম্মান করতাম। প্রায়শ তাদের বাসায় চেঁচামেচি শুনতাম। কিন্তু বিষয়টি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। আজ বিকেলে মেয়েটিকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় দেখলাম আর তারই জবানিতে সব শুনলাম তখন নিজেদের বিশ্বাস করাতেই পারছিনা মানুষ কীভাবে এতো নিষ্ঠুর হতে পারে। সবারই তো ছেলেমেয়ে থাকে। ছোটরা একটুআধটু ভুল করতেই পারে। তাই বলে এভাবে কেউ কাউকে আঘাত করতে পারে। আমরা মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আইনের আশ্রয় নিতেই প্রথমে গণমাধ্যম অফিসে বিষয়টি জানাই। এবং পরবর্তীতে মেয়েটিকে নিয়ে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করি। পুলিশ এখন আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।

পোস্টটি ফেসবুক এ শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ দিন। আপনার প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট পেতে প্রয়োজন২৪.কম পেইজ এ লাইক দিয়ে অ্যাক্টিভ থাকুন।

Share Button