,

‘মানুষটা কষ্ট পেয়েছেন, বেশ কষ্ট’

mashrafe-bin-mortaza-bangladesh-cricket20150227175638_73223_1_2

[আরিফুল ইসলাম রনি]

‘বোলিং কেমন হইছে আজ?’

তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রচুর। ঠাট্টা-মজাই বেশি। খেপানো আরও বেশি। তবে কাজের কথাও কিছু হয়। একটা সিরিয়াস কথা নিয়মিতই হয়। ওপরের প্রশ্নটা। প্রায় প্রতি ম্যাচ শেষেই জানতে চান, বোলিং কেমন হয়েছে।

নিয়মিত প্রশ্ন। তবে দুদিন আগে অবাক হলাম। বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন যে ম্যাচে, সেদিনও একই প্রশ্ন। ‘কেমন হইছে বোলিং? আরেকটু ভাল হলে ভালো হতো, প্রসন্নকে বাউন্সারটা ভালোই মারছিলাম, গ্লাভসে লেগে চার পেয়ে গেল… পরের ম্যাচে আরেকটু টাইট করা লাগবে’ … এসব। বিদায় বেলায়ও বোলিং নিয়ে ভাবে…আমি আরও একবার ভাবলাম, এই লোকটা কি মানুষ!

মানুষটা কষ্ট পেয়েছেন। বেশ কষ্ট। তার মুড, ভাবনা মোটামুটি বুঝি। তবে তার সঙ্গে আবেগ জাতীয় কথাবার্তা একরকম হয়ইনা। আমার জীবনের ভীষণ একটা দু:সময়ে তাকে পাশে পেয়েছিলাম, তখনও আবেগ জাতীয় কথা হয়নি। তিনি মন খারাপই করতে দিতেন না। হাসাতে হাসাতে অস্থির করে ছাড়তেন।

এবার একটু ইমোশনাল কথা হলো। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা হয়ত এভাবে লেখা ঠিক না। তবু তার মনের ভেতরটা বোঝাতে জরুরী বলেই লিখছি। ডিসিশানটা চূড়ান্ত হওয়ার পর শুধু বলেছিলাম, ‘কষ্ট হচ্ছে?’ সে বলল, ‘হু’। বললাম, ‘বেশি খারাপ লাগছে?’ সে বলে, ‘খেলাটা জীবন দিয়ে খেলছি ভাই। যদিও পুরাটা ছাড়ি নাই, তবু একটা তো ছাড়লাম! খারাপ লাগছে…. থাক, বাদ দেই। ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি…।’

বাদ তখন দিতেই হতো। চোখে ঝাপসা দেখছিলাম। আশেপাশে কেউ ছিল না বলে ‘চোখে পোকা পড়েছে’ ধরণের কিছু বলতে হয়নি।

অনেককেই লিখতে, বলতে শুনেছি যে মাশরাফি তো কেবল টি-টোয়েন্টি ছাড়ল, এত আবেগের কি আছে? আশা করি, মাশরাফির নিজের কথা শোনার পর বুঝবেন কেন এই উথাল-পাথাল ঢেউ। টিম হোটেলে মানুষটা বিদায়ের ঘোষণা দেওয়ার পর তখনই কেঁদেছেন তাসকিন, সোহান, মিরাজ, মোসাদ্দেকরা। সিনিয়রদের চোখের পানির জোয়ার আটকে ছিল বয়সের গাম্ভীর্যের বাধে। তবে তারাও ছিলেন আবেগ-আপ্লুত। মানুষটা বিশালত্বই এতটা যে টি-টোয়েন্টি ছাড়লেও আবেগের সুনামি ওঠে। তাকে একটু কম পাওয়াও অনেক অনেক বেশি হারানো!

কালকের ম্যাচে দলের ফিল্ডিং দেখেছেন? ছেলেরা আগেই বলেছে, অধিনায়কের জন্য খেলবে এই ম্যাচ। এই প্রতিজ্ঞার পরই আসলে শ্রীলঙ্কা হেরে গেছে। এই যে ইমরুল ফিরল, সৌম্য খেলল…প্রতি জনের নাম ধরেও যদি বলি, মাশরাফির জন্য একেকজনের যে ভালোবাসা…শুধু মাঠে বা ড্রেসিং রুমে নয়, মাঠের বাইরে… একেকজনের ব্যক্তিগত জীবনেও মানুষটির যে অবদান, যতটা ছোঁয়া, কজন এসব জানেন? দলের বা দলের বাইরের সব ক্রিকেটারের অদ্ভূত এবং কখনও কখনও বিকট রকম সব বিপদে-আপদে এই মানুষটিই ভরসা। সবচেয়ে বড় ছাতা। রাত দুপুর হোক বা কাক ডাকা ভোর, তিনি ছুটে যাবেন। সমাধান মিলিয়ে ফিরবেন।

এই মানুষটির ওপর ছেলেদের যতটা যতটা নির্ভরতা… সেটা বাইরে থেকে কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না। তবে আজ জানপ্রাণ উজার করে দেওয়া ফিল্ডিংয়ে নিশ্চয়ই সেটির কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। ছেলেরা বল ধরছিল না, যেন জয় ধরছিল। একটা চার বাঁচাতে পারলেই মাশরাফিকে কিছু একটা দেওয়া হবে! একটু একটু করে বড় কিছু দেওয়া যাবে!

আবেগের আরেকটা বড় কারণ একটা ক্ষোভও। তার বিদায়ের ধরণটি। শ্রীলঙ্কা গেলেন টি-টোয়েন্টি দলটাকে শক্ত ভিতে দাঁড় করাবেন বলে। কিন্তু ওখানে গিয়ে অবসরে চলে গেলেন। কেন? তার মতো মহীরূহ বিদায়ের ঘোষণা দিলেন টসের সময়। কেন? প্রেস কনফারেন্সে গিয়ে যখন বলেন, ‘আমার কারণে রুবেল ছেলেটা গত ২ ম্যাচে ৭ উইকেট পেয়েও চান্স পায়নি দলে’, তখন তো পর্দার আড়ালটা উন্মোচিত হয়। তাঁকে কেন শুনতে হবে যে তাঁর কারণে রুবেল দলে নেই?

কিছু লোক দেখতে পাচ্ছি, তাঁর অবসরের সময় ঠিক আছে গলা ফাটাচ্ছে, কি বোর্ডে ঝড় তুলছে। বাংলাদেশের সামনে নাকি খুব বেশি টি-টোয়েন্টি নেই। অথচ জুলাইয়ে পাকিস্তান সিরিজে টি-টোয়েন্টি আছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আছে দুইটা। আগামী বছরই বিশ্বকাপ হতে পারে, দক্ষিণ আফ্রিকায়।

তার পরও তর্কের খাতির ধরে নিলাম সে টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দেবে বলে ভাবছিল। তাহলে সেটা শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পর কেন ভাববে? নাকি দেশে লম্বা ফ্রি সময়টাতে কিছু ভাবতে পারে নাই, শ্রীলঙ্কা গিয়ে ওয়ানডে সিরিজের ব্যস্ততায় ভেবেছে? চাইলে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর যখন ক্যারিয়ার গোছানো নিয়ে ভাববে, তখন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারত। মাশরাফি নিশ্চিন্তে দুইটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বেশি খেললে নিশ্চয়ই দেশের টি-টোয়েন্টির জাগরণে বড় বাধা আসত না? কিন্তু সেই সুযোগও তাকে দেওয়া হয় নাই।

আর টি-টোয়েন্টি দিল নিয়ে যদি ভিন্ন ভাবে ভাবতে হয়, তাহলে মাশরাফিকে সরতে হবে কেন? টি-টোয়েন্টিতে দলের মূল সমস্যা ব্যাটিং। চাপের মুহূর্তগুলো জিততে না পারা। পেস বোলিং তো সমস্যা না। তাঁর নেতৃত্ব সমস্যা না। তো?

তার অবসরের সময় পারফেক্ট কি না, সেই আলোচনার তাৎপর্যই নাই। নিজে থেকে ছাড়লে সেটা নিয়ে গবেষণা করা যেত। কিন্তু তাকে বাধ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে মাশরাফির এটা প্রাপ্য?

কদিন আগের আরেকটা ঘটনা বলি। আঙুলের ইনজুরি তখনও সারেনি। হাত ছুঁইয়ে দেখছিলাম। বললাম, ‘সময়মত ঠিক হবে তো?’ সে স্বভাবমতোই চেনা হাসিতে বললো, ‘দরকার হলি এক হাতে খেলে দিবানে.. ।’ অথচ তিনি নাকি শ্রীলঙ্কায় গিয়ে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন!

‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’, এরকম এক দল লোক পাচ্ছি। তার হাঁটু, চোট নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা যেন তার নিজের চেয়ে বেশি। তার ওয়ানডে ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে নাকি টি-টোয়েন্টি ছাড়া জরুরী ছিল। কতটা হাস্যকর কথা! তার নিজের তো এটা নিয়ে দুর্ভাবনা নেই! কোনো একদিন টেস্ট খেলবেন, এই আশায় যে মানুষ এখনও টেস্ট থেকে অবসর নেননি, তিনি নাকি ৪ ওভারের জন্য টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দেবেন। আজবের চূড়ান্ত।

বরাবরই তিনি খুব নিরাপদ ক্যাচার। আজকে ক্যাচ ছেড়েছেন। রান আউট মিস করেছেন। কারণ আজ তিনি ঠিক নিজের মাঝে ছিলেন না। ম্যাচের পরে বলছেন, ব্যাটিংয়ে নামা থেকেই তার অস্থির লাগছিল। হৃদয় যখন চোট লাগে, তখন ক্রিকেটেও চোট লাগে!

সাকিব আল হাসানের জন্য ভালোবাসা। প্রথম উইকেটের উদযাপনটা যেভাবে করেছেন, সেটিই বলে দিয়েছে আজ তিনি কিছু করতে চান। কিছু দিতে চান। অসাধারণ এক বিদায়ী শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়েছেন। এর চেয়ে সুন্দর কিছু আর হয় না।

হোক টি-টোয়েন্টি, তার বিদায় এরকম হওয়ার কথা ছিল না। কোচ চিরদিন থাকবে না, এই বোর্ডও না। কোচের-বোর্ডের আরও সাফল্য আসবে, ব্যর্থতাও আসবে। কিন্তু এই মানুষটির টি-টোয়েন্টি বিদায়টা বদলানো যাবে না। দেশের ক্রিকেটকে বদলে দেওয়ার মহানায়ক আজীবন একটা কষ্ট, আক্ষেপ বয়ে বেড়াবেন ক্রিকেট নিয়েই!

যে মানুষটি কোটি কোটি মানুষকে দিনের পর দিন হাসিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাকে ভীষণ রকম চোট দিয়েছে কিছু লোক। সাতটা অপারেশনের ছুরি-কাঁচি বা অসংখ্যবার সিরিঞ্জের খোঁচাতেও অতটা চোট লাগেনি। হৃদয়ে ভীষণ ব্যাথা নিয়ে মাঠে যাওয়ার আগে ফেসবুকে দিয়ে গেছেন, ‘কেউ তোমার মূল্যায়ন করতে না পারলে নিজেকে আড়াল করে নেওয়াই ভালো। ভেবো না তুমি মূল্যহীন। আসলে তোমাকে মূলায়ন করার ক্ষমতা তার নেই!’

মানুষটির বিশালত্ব দেখুন। শেষ বেলায়ও বোর্ডকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। আসলে এই ধন্যবাদ যে একেকটা চাপড়, এটা আমরা দেখছি। যাদের দিয়েছেন, তারা অবশ্য বুঝেও বুঝবেন না। উদ্দেশ্য হাসিলের তৃপ্তির কাছে এসব নস্যি!

তিনি কষ্ট পেয়েছেন। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবে অভিশম্পাত অবশ্যই করেননি। সবচেয়ে অপছন্দের মানুষকে নিয়েও কখনও বাজে কথা বলেন না। তবে তার কষ্টের অভিশাপ তো আছে?

জেমি সিডন্সের মতো বিদায় বেলায় ‘স্যরি’ ম্যাসেজ কেউ পাঠাক বা না পাঠাক, আড়ালে কলকাঠি নাড়া লোকগুলি লোকগুলি সেই অভিশাপে পুড়বে একদিন।

————–

হ্যাঁ, সিদ্ধান্ত সে কোনো অবস্থাতেই পাল্টাবে না। উচিতও হবে না। হ্যাঁ, মাশরাফির টি-টোয়েন্টি বিদায় নিয়ে এত কথা বলতাম না, যদি না তার হৃদয়ে চোট উপহার দেওয়া হতো। যদি না তাকে কষ্ট নিয়ে যেতে হতো…

[আরিফুল ইসলাম রনির ফেসবুক থেকে]

Share Button