,

মাঠ নেই, সময় নেই খেলার : শিশু-কিশোরদের সময় কাটছে গ্যাজেটে

children using gadget

::কাশেম শাহ::

ঘটনা : ১

নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বাইরে ছেলেকে ক্লাসে পাঠিয়ে বাইরে বসে ছুটির অপেক্ষা করছিলেন কয়েকজন অভিভাবক। নানা আলাপের সূত্র ধরে ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জয় চক্রবর্তীর মা শুভ্রা চক্রবর্তী বললেন, ছেলেটার জন্য কয়েকটা গেমসের সিডি কিনতে হবে। পড়তে বললে মুখ ভার করে রাখে। বলে সারাদিন শুধু পড়া আর পড়া। একটু খেলতেও পারি না। তাকে বলি ফ্ল্যাটে তো খেলার মাঠ নেই, আশেপাশেও খেলার মত উপযুক্ত কোন মাঠ নেই, তুই কোথায় খেলবি? সে বলে, স্কুলে তো অনেক বড় মাঠ আছে, কিন্তু খেলার সুযোগ তো পায় না। স্কুল ছুটির পরপরই কোচিংয়ে যেতে হয়, তারপর আসে স্যার। তাই স্যার চলে যাওয়ার পর কম্পিউটারে কিছুক্ষণ গেমস খেলতে চাই, কিন্তু আব্বু-আম্মু ঠিকমত গেমসের সিডিও কিনে দেন না।




ঘটনা : ২

ভিআইপি টাওয়ারে পরিবারের সাথে থাকে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থী আরিফ জেবল। সে বলে আমার বাসার পাশেই আউটার স্টেডিয়াম। কিন্তু সেখানে খেলার কোন সুযোগ পায় না। জেবলের বাবা কাস্টমস কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন জেবল হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম শহরে এমনিতেই ওপেন খেলার মাঠ নেই। প্যারেড কর্নারে খেলা যেত, কিন্তু প্রতিদিন এখান থেকে যাওয়া-আসা কষ্টকর। তাছাড়া ছেলে-মেয়েদের বেশিরভাগ সময় তো এখন মোবাইল ফোন-ট্যাব, ল্যাপটপ-কম্পিউটারে চলে যায়, মাঠে গিয়ে খেলার সময় বা কোথায়?

বাস্তবতা এখন এমনই। চট্টগ্রাম শহরে খেলার মত মাঠ বলতে গেলে নেই। যেসব মাঠ আছে সেসব মাঠ বছরের বড় একটা সময় জুড়ে থাকে মেলা আর নানা অজুহাতের দখলে। আবার ঠিক উল্টো ব্যাপারও আছে। খেলার মত যথেষ্ট সময় শিশু-কিশোরদের নেই। তাদের বেশিরভাগ সময় কাটছে নানান গ্যাজেটে। কেউ মোবাইল ফোন, কেউ বা ল্যাপটপ-কম্পিউটারে গেমস কিংবা ইন্টারনেট নিয়ে কাটাচ্ছে ব্যস্ত সময়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কখনও বস্ত্রমেলা, কখনও বৃক্ষমেলা, কখনো বা বিজয় মেলার নামে সারাবছরই দখল থাকে আউটার স্টেডিয়াম। খেলার মাঠগুলো এভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের শিশু-কিশোররা খেলার সুযোগই পাচ্ছে না। নগরীর ৯৫ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই নেই নিজস্ব মাঠ। হাতেগোনা যে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই খেলাধুলার অনুপযোগী। এছাড়াও নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন মাঠ তৈরি করা না হলেও যেসব খেলার মাঠ রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগেই খেলাধুলার সুযোগ পান না খেলোয়াড়রা। ওই মাঠগুলোর বেশ কয়েকটি রয়েছে অন্যদের দখলে। জাম্বুরি মাঠ, লালদীঘি মাঠ, আউটার স্টেডিয়াম, পলোগ্রাউন্ডসব দখল হয়ে থাকে সারাবছর। নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায় এক সময় খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র ছিল জাম্বুরি মাঠ। সেই মাঠে এখন চাষাবাদ করা হচ্ছে। অর্ধেক জুড়ে গড়ে তোলা হেয়ছে কর্ণফুলী শিশু পার্ক। খেলাধুলার আর সুযোগ নেই। নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠ ও আউটার স্টেডিয়াম মাঠ বছরের অধিকাংশ সময়ই থাকে মেলার দখলে। লালদীঘি মাঠও অধিকাংশ সময়ই মেলা ও রাজনৈতিক জনসভার জন্য বরাদ্দ থাকে। তাই চট্টগ্রামে খেলাধুলার জন্য কোন খোলা মাঠ নেই বললেই চলে।



এ অবস্থায় ছেলে মেয়েরা মাঠে গিয়ে খেলাধুলার পরিবর্তে কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই সময় কাটাচ্ছে বেশির ভাগ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে করে কিশোর-কিশোরীরা সাময়িক স্বস্তি খুঁজে পেলেও এটা তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে।

দেখা যাচ্ছে, আজকাল বিশ্বব্যাপী যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষের একটা বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। যাকে ‘গ্যাজেট প্রেম’ বললে হয়তো ভুল হবে না। র্স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ,ডিজিটাল ক্যামেরা এসব যন্ত্র কিনতে আজকাল অনেক অর্থ খরচ করছেন অনেকে। লিভিং রুম,রান্না ঘর বা আরও অনেক জায়গায় শোভা পাচ্ছে যন্ত্রপাতি। এসব পণ্যের জন্য ব্যাপক সময়ও দিচ্ছেন গ্যাজেট প্রেমিরা। বিশ্বের এসব পণ্য কোম্পানিগুলো নেমেছে নিত্য নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার প্রতিযোগিতায়।

জিইসি মোড়স্থ সেন্ট্রাল মপিং কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, এখানকার বিভিন্ন দোকানে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ডিজিটাল ক্যামেরা, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও কম্পিউটারের নানান যন্ত্রপাতি পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী ছেলে মেয়েরা প্রতিদিন এখানে আসছেন। ঘুরে ঘুরে দেখছেন তার পছন্দের গ্যাজেটটি খোঁজবার জন্য। দিনরাত চলে গ্যাজেট শপিং। কি ফিচার আছে তাতে? কত মেগা পিক্সেল ক্যামেরা? কত তার র‌্যাম বা ইন্টারনাল মেমরি। প্রসেসর ফাস্ট হবে তো? কোন ভার্সনের অ্যান্ড্রয়েড? নতন গেমসের কোন সিডিটা বাজারে এসেছে? ইত্যাদি নিয়ে চলছে আলাপচারিতা। একটি স্মার্টফোন দোকানের সেলসম্যান কাস্টমারকে লম্বা সময় ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন স্মার্টফোনের ফিচার। বোঝাতে চাচ্ছেন এই পণ্যটিই বাজারের সেরা।

সবার হাতে হাতে যে গ্যাজেটটি আছে তা হচ্ছে স্মার্টফোন। কিছুক্ষণ পরপর তা ঘেটে দেখাটা এখন অনেকের অভ্যেস। ঠিক তেমনি পুরো বাজার ঘুরে পছন্দের একটি ফোন কিনেছেন হুসেইন মোহাম্মাদ। তিনি বলেন, বাজারে এসে ঘেটে ঘেটে দেখলাম। কারণ প্রতিযোগিতার বাজারে প্রতিদিনই নতুন নতুন ফোন বাজারে আসছে। এজন্য সিমফোনি, স্যামসাং, ওয়াল্টন সব ঘেটে দেখলাম। র‌্যাম, ক্যামেরা ভাল হওয়া লাগবে। ফেসবুক, স্কাইপি ইত্যাদি যেসব সোসিয়াল অ্যাপ আছে সেগুলো থাকতে হবে। আর এগুলো দেখেই সাধারণত কেনা হয়।

শুধু স্মার্টফোনে আজকাল চলছে না অনেকের। অনেকের পকেটে থাকতে হবে আইফোন। হ্যান্ডব্যাগে ট্যাবলেট আর ঘরের টেবিলে শোভা পাচ্ছে ল্যাপটপ। কম রেজুলেশনের ডিজিটাল ক্যামেরায় আজকাল আর পোষায় না। কিনতে হবে ডিএসএলআর ক্যামেরা। বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইমরুল মারুফ। এতগুলো যন্ত্রপাতির গর্বিত মালিক সে। এগুলোর ফিরিস্তি দিয়ে বলছিলেন, কোনটা তার কী কাজে আসে। তিনি বলেন, গ্যাজেট ছাড়া আজ চলা সম্ভব না। আমি আইফোন, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট এগুলো সবই ব্যবহার করি। এতোগুলো ফোন কি করেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাসা থেকে বের হলে র্স্মার্ট ফোন দরকার হয়। বাসায় থাকলে ল্যাপটপ ব্যবহার করা হয়। ট্যাব সাধারণত যখন রাত্রে ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমাতে যায় তখন শুয়ে শুয়ে ব্যবহার করা হয়। আর আইপ্যাড ব্যবহার করি গান শোনার জন্য। কারণ আইপ্যাডে গান শুনতে ভাল লাগে।

ইমরুলের মতো আজ অনেকেই বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন গ্যাজট। লিভিং রুম, রান্না ঘর,পড়ার টেবিলেও শোভা পাচ্ছে এসব। তবে কাজে লাগানো ছাড়াও অনেকেই এসব কিনছেন কারণ তাদের আপডেট থাকাটা খুব জরুরি। আর অনেকেই আছেন শুধু বিনোদনের জন্য এসব ব্যবহার করেন। স্যানমার ওশান সিটির একটি দোকান মালিক জয়নাল আবেদীন বলেন, জিনিসগুলোর খুব দ্রুত আপডেট আসছে। তাই একটা কেনার পরে যখন আবার আপডেট আসছে তখন সে আবার তা কিনছে। এর মধ্য থেকে একটা বিনোদনও খুঁজে পাচ্ছি।

ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সবকানেই গড়ে উঠেছে ইলেক্ট্রিক সামগ্রীর দোকান, শপিং মল। গ্রামেগঞ্জেও মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপের মত গ্যাজেট দেখা যাচ্ছে হাতে হাতে। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সমিতি বলছে গত বছর মোবাইল ফোন আমদানি হয়েছে আনুমানিক ৮০ লাখের মতো। আর রেভিনিউ বলছে, আজকাল দেশে ল্যাপটপের ব্যবসা হচ্ছে বছরে আনুমানিক ছয়শ’ কোটি টাকার মতো।

ফলে মাঠে গিয়ে খেলার সময় পাচ্ছে না শিশু-কিশোরেরা। একদিকে পড়ালেখার চাপ অন্যদিকে যে টুকু সময় পাওয়া যাচ্ছে তার সবটাই ব্যয় হচ্ছে নানান রকমের গ্যাজেটের পেছনে। অভিভাবকরা যদিও এর জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।

নগরীর একটি মিষ্টি কারখানায় কর্মরত সোলায়মান আলম বলেন, আমার তিন ছেলে মেয়ে। হালিশহরে আমরা ভাড়া বাসায় থাকি। এখানে আর্টিলারি মাঠ আছে, বিডিআর মাঠ আছে,আবাহনী মাঠ আছে। কিন্তু সেখানে সাধারণত খেলার সুযোগ পাওয়া যায় না। স্কুল থেকে ফিরে আবার খেলার মাঠে যাওয়ার মত সময় যেমন থাকে না তেমন মাঠগুলোও রেগুলার খেলোয়াড়দের দখলে থাকে। মাঝেমধ্যে মেলা কিংবা গাড়ি পার্কিং করতেও দেখা যায়।

অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই খেলার মাঠের ভীষণ সংকট রয়েছে। এর মধ্যে আউটার স্টেডিয়ামসহ হাতেগোনা যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোও বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকছে মেলার দখলে। এটা এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ,খেলার মাঠের সংকট থাকায় এই শিশু-কিশোররা খোলা মাঠে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। এ কারণে তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খেলার মাঠ না থাকায় তারা টিভিতে কার্টুন দেখা আর কম্পিউটারে গেমস খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকছে।

শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা, আফরাতুন নুর বলেন, এখন যেসব শিশুর বয়স ১২ থেকে ১৪ বছর,৩০ থেকে ৩২ বছর বয়সেই তাদের দুরারোগ্য ব্যাধি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া তাদের সঠিক ও পূণাঙ্গ মানসিক বিকাশের জন্য খোলা মাঠে, আলো-বাতাসে খেলাধুলার যথেষ্ঠ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

Kashem Shah

কাশেম শাহ

খবরটি ফেসবুক এ শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ দিন। আপনার প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট পেতে প্রয়োজন২৪.কম পেইজ এ লাইক দিয়ে অ্যাক্টিভ থাকুন।

Share Button