টিউশন মিডিয়ার আড়ালে ‘ভয়ংকর’ মিডিয়া

টিউশন মিডিয়ার আড়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছে একটি প্রতারক চক্র। টিউশন ফি হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে দুই মাস পর সেই শিক্ষককে বাদ দেয়া, প্রতিষ্ঠানের ভুল পরিচয় দেয়া থেকে নারীদের হয়রাণি করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, টিউশন দেয়ার আগেই সম্মানির ৭০ থেকে ৮০ ভাগই আদায় করে নেয় টিউশন মিডিয়াগুলো। নগরের অলিগলিতে এভাবে প্রতারণা চললেও প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব মিডিয়া টিউশনি দেওয়ার নামে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, দেয়ালে, বিদ্যুতের খুঁটিতে পোস্টারিং করে। পরে টিউশন প্রার্থীদের কাছ থেকে সদস্য ফি’র নামে টাকা নিয়ে তারা লাপাত্তা হয়ে যায়।

জানা যায়, টিউশন মিডিয়া চট্টগ্রাম, পারফেক্ট টিউটরস, টিচার্স ফেয়ার, টিচার্স মিডিয়া, টির্চাস হেভেন, টিচার্স একাডেমি, টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন, টিচার্স ফোরাম, টিচার্স ব্যাংকিং মিডিয়া, টিচার্স ক্লাবসহ নানা নামে কোতেয়ালী, চকবাজার, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ, স্টেশন রোড, পাহাড়তলি, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গড়ে ‍উঠেছে এসব মিডিয়া।

এই ধরনের মিডিয়াগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছে শিক্ষার্থীদের জন্যে। বিভিন্ন নামে পেইজ ও গ্রুপ খুলে টিউশনের বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে তারা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজসহ সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের নামে গৃহশিক্ষক দেয়ার কথা বলেই চলছে টিউশন মিডিয়ার ব্যবসা।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নিজের খচর মেটানোর তাগিদে, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অসচ্ছলতার কারণেই এসব টিউশন মিডিয়ার কাছ থেকে টিউশন নিতে বাধ্য হয়। বিপরীতে শিক্ষার্থীদের ভাল ফলাফলের দুশ্চিন্তাকে পুঁজি করে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবসা চালাচ্ছে টিউশন মিডিয়াগুলো। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দুই পক্ষই।

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী তানজিমা আকতার। তিনি ফেসবুকে শিক্ষক চাই এমন একটি পোস্ট দেখে যোগাযোগ করেন ষোলশহর দুই নাম্বার গেট এলাকার একটি টিউশন মিডিয়ার সাথে।

তাকে নগরীর জামালখানে একটি টিউশন দেয়ার কথা বলে দেড় হাজার টাকা নেয়া হয়। দুদিন বাদে সে জামালখান নির্দিষ্ট বাসায় গেলে তাকে জানানো হয় তাদের এর মধ্যেই নতুন শিক্ষক চলে এসছে। পরে সে টাকা ফেরত চাইলে তাকে দুই তিন মাস টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাস দিয়েও সেই টাকা ফেরত দেয়নি তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংগুয়িস্টিক নিয়ে পড়ছেন রুখসানা আঁখি। তিনি জানান, আমি একটি টিউশন মিডিয়ার সাথে কথা বলে টিউশন পাইনি উল্টো তারা আমার নাম্বারে বারবার কল করে উত্যক্ত করেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জহিরুল জনি বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষক দিচ্ছি আর শিক্ষক নিচ্ছি এরকম বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের সাথে সমানে প্রতারণা করে আসছে। কোন অভিবাবক চবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক চাইলেও তারা ভুল পরিচয় দিয়ে সেই শিক্ষককে পড়াতে পাঠাচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন অভিবাকরাও।

মনসুর আলী নামে অক্সিজেনের এক বাসিন্দা সিভয়েসকে জানিয়েছেন, আমার ছেলেকে পড়ানোর জন্যে টিউশন মিডিয়া থেকে একজন শিক্ষককে পাঠানো হয়। আমাকে বলা হয়েছিল সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সে ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড লিংগুয়িস্টিকস বিভাগে পড়ে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ২ নম্বর গেইটের টিউশন মিডিয়ার সাথে জড়িত এক ব্যক্তি জানান, আমাদের বিরুদ্ধে অনেক রকম অভিযোগ শোনা যায়, এগুলোর সত্যতা নেই। আমরা ছাত্রদের সহযোগীতা করতেই মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকি।

সুশাসনের জন্যে নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি এবং ইডিইউ উপাচার্য প্রফেসর সিকান্দার খান এ ব্যাপারে বলেন, বর্তমান যুগটা প্রচারের। প্রচার ছাড়া কেউ তার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু এর সুযোগ নিচ্ছে একটি সুযোগসন্ধানী মহল। তবে আমাদের অভিবাবকরাও এসব ব্যাপারে সচেতন নন। তারা যদি সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে চান তারাও শিক্ষক নিয়োগের সময় সচেতন হতে হবে। নয়ত এসব টিউশন মিডিয়ার দৌরাত্ম্য চলতেই থাকবে। অভিবাবকরা যদি টিউশন মিডিয়ার কাছে না গিয়ে নিজেরা যাচাই বাচাই করে শিক্ষক নিয়োগ করেন তবে এই সমস্যা থাকবে না।

 

Post Courtesy: সিভয়েস