,

জেনে নিন জন্মনিয়ন্ত্রণের অস্থায়ী পদ্ধতিসমূহ

birth control

::ডা. নওশিন শারমিন পুরবী::

জীবনকে সুখী ও সুন্দর করার লক্ষ্যে স্বামী-স্ত্রী দুজনে চিন্তা-ভাবনা করে পরিকল্পিত পরিবার গঠন খুবই জরুরি। সন্তান নেয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই চিন্তা করা উচিত- তারা কখন সন্তান নিতে চান? সন্তান নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি তাদের আছে কিনা? সন্তান জন্মের পর তাকে আদর যত্ন ও মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করে লালন-পালন করার মতো যথেষ্ট সময় ও আর্থিক সচ্ছলতা তাদের আছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া বিয়ের পর পরস্পরকে বোঝার ও জানার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন হয়। জেনে নিন জন্মনিয়ন্ত্রণের অস্থায়ী পদ্ধতিসমূহ,



দেরিতে সন্তান চাইলে বা কোনো সন্তান না চাইলে পরিবার-পরিকল্পনার পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। এর মাঝে কতোগুলো অস্থায়ী অর্থাৎ যতোদিন এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে ততোদিন মহিলাটি গর্ভবতী হবে না। ব্যবহার বন্ধের পর বাচ্চা চাইলে আবার সন্তান ধারণ সম্ভব। খাবার বড়ি, কনডম, ওটঈউ, ইনজেকশন, নরপ্ল্যান্ট এদের মধ্যে অন্যতম।

মহিলাদের জন্য লাইগেশন ও পুরুষদের জন্য ভ্যাসেকটমি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

যে সকল মহিলার প্রতিমাসে মাসিক হয় সাধারণত ধরে নেয়া হয় তাদের মাসিক শুরু হবার ১০ থেকে ১৮তম দিনের যেকোনো ১ দিন ডিম্বাশয় থেকে ১টি পরিপক্ক ডিম্বাণু নিঃসরিত হয়। ডিম্বাণুটি নিঃসরণের পর মাত্র ১ দিন সময় থাকে তা নিষিক্ত হবার জন্য। এ কারণে কেউ যদি ঐ সময়ে দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকেন তবে তার সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কম থাকে।

অন্যভাবে বলা যায় মাসিক শুরু হবার পর থেকে পুরো সময়টিকে ৩ ভাগে ভাগ করে গড়ে মাঝের ১০ দিন দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকলে তা জন্মনিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ১ম ১০ দিন এবং শেষ ১০ দিন সময় নিরাপদ। তবে অনিয়মিত মাসিকের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।

যে সময়ে মহিলাদের ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়, খুব খেয়াল করলে দেখা যায় জরায়ুর মুখ থেকে সে সময়ে পরিষ্কার, স্বচ্ছ, টানলে দৈর্ঘ্য বড় হয় এরকম স্রাব নিঃসৃত হয়। আর নিরাপদ সময়ে অস্বচ্ছ, আঠালো, টেনে বাড়ানো যায় না এমন স্রাব নিঃসৃত হয়।

এছাড়া শরীরের তাপমাত্রা এ সময় কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এসব বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখে অনেকেই তাদের উর্বর সময় বেছে নিয়ে ঐসময়ে দৈহিক মিলন থেকে বিরত থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

সে সব মায়েরা সন্তান জন্মদানের পর শিশুদের কেবল মাত্র বুকের দুধ খাওয়ান তাদের ক্ষেত্রে এই বুকের দুধ খাওয়ানোটাই শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজ করে।

আমাদের দেশে অনেক ধরনের আধুনিক, নিরাপদ ও কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। দম্পতিরা পদ্ধতিগুলোর সুবিধা, কার্যকারিতা ও ব্যবহার বিধি ভালোভাবে জেনে এদের মধ্য থেকে নিজেদের পছন্দমতো ও উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন।

জন্মনিয়ন্ত্রণ অস্থায়ী ব্যবস্থাসমূহ

খাবার বড়ি :

বহুল ব্যবহৃত ১টি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ‘খাবার বড়ি’। ১টি বড়ির পাতায় সাধারণত ২৮টি বড়ি থাকে। ২১টি সাদা রঙের বড়ি এবং ৭টি খয়েরি রঙের আয়রন বড়ি। সাদা বড়িতে ২টি হরমোন আছে যা গর্ভধারণ প্রতিরোধ করে।

এটি প্রতিমাসে ডিম্বাণু নিঃসরণ বন্ধ রাখে। জরায়ুর মুখের রসকে ঘন করে ফলে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না এবং নিষিক্ত ডিম্বাণুকে জরায়ুতে গেঁথে যেতে দেয় না।

সঠিকভাবে গ্রহণ করলে এটি ৯৭ থেকে ৯৯ ভাগ কার্যকর। মাসিকের ১ম দিন থেকে ২১ দিন পর্যন্ত নিয়মিত একই সময়ে সাদা বড়ি খেতে হয়। এরপর প্রতিদিন ১টি করে আয়রন বড়ি বা লাল বড়ি খেতে হবে। খয়েরি বড়ি বা আয়রন বড়ি খাওয়া শুরু করার ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সাধারণত মাসিক শুরু হয়। মাসিক শেষ হোক বা নাই হোক খয়েরি বড়ি শেষ হবার পরদিন থেকেই ১টি নতুন পাতা থেকে পূর্বের নিয়মে পুনরায় সাদা বড়ি খাওয়া শুরু করতে হবে।

১ দিন বড়ি খেতে ভুলে গেলে পরদিন মনে হবার সঙ্গে সঙ্গে ১টি (ভুলে যাওয়া বড়ি) এবং নির্ধারিত সময়ে আরো ১টি (ঐ দিনের জন্য নির্ধারিত) বড়ি খেতে হবে। অর্থাৎ সেদিন ২টি বড়ি খেতে হবে।

গর্ভপাত বা গজ করাবার পরপরই বড়ি খাওয়া শুরু করতে হয়।

ডায়রিয়া বা বমির কারণে খাবার বড়িটি ঠিকমতো শরীরে শোষিত না হলে অনেক সময় বড়ি গ্রহণ অবস্থায়ও মহিলারা গর্ভবতী হয়ে যেতে পারেন।

খাবার বড়ি গ্রহণে মাসিকের সময়ের অতিরিক্ত পেটে ব্যথা, রক্তশূন্যতা, ডিম্বাশয় ও জরায়ুর ক্যান্সার, একটোপিক প্রেগনেন্সি, স্তনের টিউমারের ঝুঁকি কমে যায়। এ ছাড়া তার অনিয়মিত মাসিককে নিয়মিত করে।

শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে খাবার বড়ি বন্ধ করার ৩ মাসের মধ্যে ঙাঁষধঃরড়হ নিয়মিত হয়ে যায় এবং মহিলাটি চাইলে আবার গর্ভবতী হতে পারে।

খাবার বড়ি গ্রহণে অনেকের ১ম দিকে বিশেষ করে ১ম ৩ থেকে ৪ মাসে ছোটখাটো অসুবিধা বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমনÑ বমিভাব, মাথা ধরা, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত যাওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া, স্তন ভারী বোধ করা, মুখে কালো ছোপ পড়া ইত্যাদি। এর বেশির ভাগই পরবর্তীতে চলে যায়।

তবে অনেকের রক্তে ঈযড়ষবংঃবৎড়ষ বা চর্বির মাত্রা বেড়ে যায়, লিভারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, পিত্তথলিতে পাথর হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে যাবার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইনজেকশন :

সহজ, নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ আরেকটি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এই ইনজেকশন। এটি ৩ মাস মেয়াদি। কার্যকারিতার হার শতকরা ৯৮ থেকে ৯৯ ভাগ। এখানে কেবল মাত্র ঢ়ৎড়মবংঃবৎড়হব হরমোন ব্যবহৃত হয়।

এটি ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু পরিপক্ব হতে বাধা দেয়, জরায়ুর মুখের রসকে ঘন ও আঠালো করে, যাতে শুক্রাণু প্রবেশ করতে না পারে এবং জরায়ুর ভেতরের আবরণকে গর্ভসঞ্চারের অনুপযোগী করে গড়ে তোলে।

হাত বা নিতম্বের গভীর মাংসপেশিতে মাসিক শুরু হবার ৭ দিনের মধ্যে ইনজেকশন নিতে হয়। যারা বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন কিংবা প্রতিদিন মনে করে বড়ি খেতে অসুবিধা বোধ করেন তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী।

এটি গ্রহণে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, অনেক দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে বা ফোঁটা ফোঁটা রক্তস্রাব যেতে পারে, এ পদ্ধতি ছেড়ে দেয়ার ৬ থেকে ১২ মাস পর মাসিক ফেরত আসতে পারে। তবে ঙাঁষধঃরড়হ যে কবে শুরু হবে তা অনেক ক্ষেত্রে বলা যায় না।

নরপ্ল্যান্ট :

১টি দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নাম নরপ্ল্যান্ট। কার্যকারিতার মেয়াদ ৫ বছর। নরপ্ল্যান্টের সেটে ৬টি ছোট নরম চিকন ক্যাপ্সুল থাকে, যা মহিলাদের হাতের ভেতরের দিক- কনুইয়ের ওপরে- চামড়ার ঠিক নিচে স্থাপন করা হয়।

ইনজেকশনের মতো এখানেও ঢ়ৎড়মবংঃবৎড়হব হরমোন থাকে। কাজ করে ঐ একই ভাবে। শতকরা ৯৯ ভাগ কার্যকর। এটি ১ বার গ্রহণে পরবর্তী ৫ বছর অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের ঝামেলা থাকে না। মেয়াদ শেষ হবার আগেও এটি খুলে নেয়া যাবে।

নরপ্ল্যান্ট লাগাতে ও খুলতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের সাহায্য নিতে হয়। হাতের চামড়ার নিচে হালকাভাবে দেখা যায় বলে অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। নরপ্ল্যান্ট লাগানোর ১ মাস পর ক্লিনিকে এসে পরীক্ষা করাতে হয়। পরবর্তীতে ৬ মাস পর এবং এরপর প্রতি বছরে ১ বার এসে পরীক্ষা করাতে হয়।

যদি কোনো দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ ছাড়াই দৈহিক মিলনে লিপ্ত হন কিন্তু তারা এখন হয়তো বাচ্চা নিতে চাইছেন না, এছাড়া যদি তারা বুঝতে পারেন তাদের ব্যবহৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিটি হয়তো ঠিকমতো কাজ করবে না, সে ক্ষেত্রে দৈহিক মিলনের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার পার্থক্য ২টি ট্যাবলেট খাবার উপদেশ দেয়া হয়।

বিকল্প হিসাবে একই সঙ্গে ৪টি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেয়ে তার ১২ ঘণ্টা পর আবার ৪টি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এক সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।

এটি শতকরা ৯৮ ভাগ কার্যকর। তবে যদি ওষুধ খাবার ৩ সপ্তাহের মধ্যে মাসিক না হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলা হয়।

একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এটি জরায়ুর ভেতরে স্থাপন করতে হয়। প্রকার ভেদে এটি ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারে। সফলতার হার ৯৭ থেকে ৯৯ ভাগ। মেয়াদ শেষের পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি দিয়ে খুলিয়ে নতুন ওটঈউ পরা যায়। এটি জরায়ুর ভেতরে শুক্রাণু চলাচলের পথে বাধা তৈরি করে ফলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলতে পারে না এবং জরায়ুর গায়ে ভ্র্রণটিকে গেঁথে যেতে দেয় না।

যারা হরমোন জাতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন না তাদের জন্য এটি আদর্শ পদ্ধতি। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মহিলাটিকে ১টি জীবিত সন্তানের মা হতে হবে।



এর নিচের দিকে ১টি নাইলনের সুতা থাকে এই সুতার সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখা যায় ওটঈউটি ঠিক জায়গায় আছে কিনা। এছাড়া আলট্রাসনোগ্রাম ও এক্সরে করে এর অবস্থান শনাক্ত করা যায়।

অনেক সময় এটি আপনাআপনি বের হয়ে যেতে পারে তাই প্রত্যেক মাসিকের পর সুতাটিকে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। ব্যবহারকারীরা প্রায়ই ফোঁটা ফোঁটা রক্ত যাওয়া, তলপেট মোচড়ানো ব্যথা, অতিরিক্ত স্রাব যাওয়া অভিযোগ করেন।

কনডম :

পুরুষদের ব্যবহারের জন্য ১টি নিরাপদ, অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এটি ব্যবহারে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না।

সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শতকরা ৯৭ ভাগ কার্যকর। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। পাশাপাশি এটি যৌনবাহিত রোগ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।

প্রতিবার সহবাসের সময় ১টি নতুন কনডম ব্যবহার করতে হয়। ৫ বছরের বেশি পুরোনো বা মেয়াদউত্তীর্ণ কনডম ব্যবহার করা উচিত নয়।

নববিবাহিত, যার স্ত্রী সম্প্রতি সন্তান প্রসব করেছেন, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, যে দম্পতি দুজন দু জায়গায় থাকেন এবং মাঝে মাঝে সহবাসে মিলিত হন, যার স্ত্রী পরপর ২ বা তার বেশি দিন খাবার বড়ি খেতে ভুলে গেছেন- তারা মাস শেষ হওয়ার বাকি দিনগুলোতে কনডম ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া যারা অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণের কথা ভাবছেন কিন্তু এখনো মনস্থির করতে পারছেন না কিংবা ভ্যাসেকটমির পর ২০ বার সহবাসের সময় কনডম ব্যবহার করা উচিত।

লেখক : চিকিৎসক, গাইনী বিভাগ
আনোয়ার খাঁন মর্ডান হাসপাতাল
ধানমণ্ডি, ঢাকা।

খবরটি ফেসবুক এ শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ দিন। আপনার প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট পেতে প্রয়োজন২৪.কম পেইজ এ লাইক দিয়ে অ্যাক্টিভ থাকুন।

Share Button