,

আমরা শুধু গ্র্যাজুয়েট তৈরি করিনা, আমরা ‘মানুষ’ বানাই

cu- চবি সমাবর্তন

আদনান মান্নান >>

কালকের ব্যাপারটা একদমই ভিন্ন। একেবারে অন্যরকম কিছু মানুষের জন্য বিশেষ একটা দিন এটা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আগামীকাল। আর দশজন ছাত্রের চেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যাত্রাটা একদমই অন্যরকম এবং সে কারনেই এখান থেকে স্নাতক হয়ে বের হওয়াটাও একটু ভিন্ন। আমরা শুধু গ্র্যাজুয়েট তৈরি করিনা, আমরা “মানুষ” বানাই। কিভাবে?

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশায় করে পাচ মিনিটে ক্লাস করতে যাবে? দুঃখিত! ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছেন। রিকশায় চড়ে, তারপর টেম্পো কিংবা রাইডার বদল করে শেষ পর্যন্ত ষোলশহর বাস স্টেশনে ভিড়ের জনসমুদ্রে বিজয়ী হয়ে শাটল ট্রেনে চড়ে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পোঁছানো। এরপর রয়েছে আরও দশ পনের মিনিটের হাটা।

সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় ঘণ্টার যাত্রা কাহিনি। এরা একেকজন সংগ্রামী, পরিশ্রমী। এত ভিড় আর ঘর্মাক্ত শরীর নিয়েও তারা কিন্তু মন খারাপ করেনা, পুরো শাটল ট্রেন গান গাইতে গাইতে তারা কাটিয়ে দেয়, আনন্দময় করে তোলে। এরা জীবনকে যেকোনো অবস্থায় উপভোগ করতে জানে, জীবনের আনন্দ অনেক ছোট্ট কিছু থেকেও খুজে নিতে জানে। পহেলা বৈশাখে পুরো একটা ট্রেনকে তারা তুলির রঙে রাঙিয়ে তোলে, অদ্ভুত সুন্দর কারুকার্যে। এরা সৃজনশীল। আবার এই ছেলেমেয়েরাই রাস্তায় নেমে পড়ছে অসুস্থ সহপাঠীর জন্য, দুই সপ্তাহে যোগাড় করে চিকিৎসার দশ লক্ষ টাকা।

এরা মানবিকতা বোধে উদ্বুদ্ধ। যেকোনো ক্রান্তিকালে তারা এগিয়ে আসে, মিছিলে, জাগরনে, প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। তারা বিপ্লবী। আবার এই ছেলেমেয়েগুলোই ফরেস্ট্রির পুকুরপাড়ে ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া অব্যক্ত জলের ধারার মাঝে প্রিয়তমার হাত ধরে, শহীদ মিনারের সামনে পুর্নিমার চাঁদ দেখে কারও চোখে চোখ রাখে। আহ! তাদের উদাসী প্রেমিক মন। “বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ হেঁটে হেঁটে কত দিন রাত্রি গেছে কেটে !”



শেষবেলায় এসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বছরের যাত্রা শেষে তারা শুধু স্নাতক বা গ্রাজুয়েট হয়না, একেকজন মানবিক জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ “মানুষ” হয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগে এক ছাত্র ফেসবুকে লিখেছিল, “শিক্ষকদের আমি কখনো মিস করবনা”। অবশ্য পৃথিবীর সব জায়গাতেই ছাত্রদের সবচেয়ে অপছন্দের জায়গাগুলোর একটা হল “শিক্ষক”। তারপরেও বলব- “আমাদের মিস করতে হবেনা, আমরা তা চাইও না। আমরা চাই, তোমরা ভাল থাক, জীবনে যতদূর যেতে চেয়েছিলে, ততদুর যাও। বরং তোমাদেরকেই আমরা মিস করি যখন লম্বা ছুটির পরে এসে যখন দেখি বারান্দা আর ক্লাস রুমগুলো খাঁ খাঁ করছে, তোমাদের মিস করি যখন বাইরে গবেষনা করতে এসে ক্লাস নিতে না পারার, পড়াতে না পারার তীব্র যন্ত্রনা অনুভব করি, তোমাদের মিস করি যখন অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমাদের কেউ চেনেনা কিংবা কাছে এসে কেমন আছেন সার এটা বলার কেউ থাকেনা।” বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ। এবার তুমি নিজেই নিজেকে মেলে ধরবে স্বাধীনভাবে।তোমার মুক্তি আলোয় আলোয়।

বুয়েট, মেডিকেল কিংবা আইইবিএ তে সুযোগ না পাওয়ার অনেক দুঃখ নিয়ে অনেকেই হতাশা নিয়ে এখানে পড়তে আসে। কিন্তু সেই তোমরাই এখান থেকে পাশ করে এখন হার্ভার্ড, টেক্সাস, ম্যানচেস্টার, মেলবোর্ন, টোকিও’র মত সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছ পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবীদের সাথে। একদিনের একটা দুই ঘন্টার লিখিত পরীক্ষা কখন ভাল ছাত্র বা খারাপ ছাত্র বিভাজন তৈরি করতে পারেনা, সেটাই এই ছাত্ররা প্রমান করে। সমাবর্তনে থাকতে পারছিনা দেশের বাইরে থাকায়। সবাই কে অভিনন্দন, ভালবাসা, শুভেচ্ছা স্নাতক হওয়ার জন্য। একটা ছোট্ট অনুরোধ- সমাবর্তনে যখন তোমাদের দাড়াতে বলবে- রাষ্ট্রপতির সামনে ডিগ্রি প্রদানের জন্য- সবাই একটু পেছনে ডান দিকে ফিরে তাকাবে, অল্প একটু মাথা নিচু করবে কিছু মানুষকে অভিবাদন জানানোর জন্য। তোমার বাবা মা, যাদের পঁচিশ বছরের পরিশ্রম স্বার্থক হতে যাচ্ছে, তোমার বন্ধুরা যাদের নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর ত্যাগে তুমি এই ডিগ্রীটা পাচ্ছ, তোমার শিক্ষকরা যাদের চোখের সামনে তুমি পাঁচ বছরে তিলে তিলে বড় হয়ে উঠেছ। শেষে জীবনানন্দ দাশের মত বলব -‘একদিন এমন সময়;আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–পঁচিশ বছর পরে!’

আদনান মান্নান

আদনান মান্নান

সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনলোজি ডিপার্টমেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ফেসবুক কর্ণার এ প্রকাশিত লেখা প্রয়োজন২৪ এর নিজস্ব প্রতিবেদন নয়, ফেসবুক ব্যাবহার কারীদের মতামত।’

Share Button