,

‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং আম্রিকান জীবন’

New-York-City-USA

::রিভানা শরফুদ্দিন::

আন্ডারস্ট্যান্ডিং আম্রিকান জীবন : এখানে এসেই আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। সেটা হইলো বাংলাদেশ একটা অসাধারণ দেশ। এখানের ইমিগ্রেন্টদের অধিকাংশ সময় বলতে শুনি ‘ভালো হইসে চলে আসচো, দেশের কোনো ঠিক নাই, জীবনের গ্যারান্টি নাই ! কিন্তু কেও কি জানে এমেরিকা স্বাধীন হইসে ১৭৭৬ এ আর বাংলাদেশ ১৯৭১ !!!একটা দেশকে দেশ হইতে তো সময় লাগে…

সবাইকে দেশে বলতে শুনি স্বাধীনতার ৪০ বছরে এসে কি পেলাম। আরে এমেরিকার জন্মের পর ১০০ বছরই লাগসে কালোদের মানুষ হিসাবে স্বীকার করসে। ইতারা যখন বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার নিয়ে নাক সিটকায় থাপড়ায় দুই গালে দুইটা চড় মারতে মন চায় !!! 

সব বুঝলাম। কিন্তু আজকে যেই জিনিস জনসমক্ষে বলতে যাবো সেটা হচ্ছে… আমরা সাউথ এশিয়রা মারা খাই বেঁচে আসি কারণ আমরা বলদ !!! সোজা বাংলায় আমরা বলদ !!! আম্রিকানরা আগায় আসে … দুনিয়া চালাচ্ছে … দুনিয়ার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কারণ তারা জিনিয়াস। আসলেই জিনিয়াস।
এমেরিকা দেশটা কি? তারা দেশ হওয়ার আগে কি ছিল? এসব জানার চেয়েও বড় প্রশ্ন একটা ভুখন্ড দেশ হতে কি কি লাগে? জাতি হতে কি কি লাগে? দেশ আর জাতি জিনিসটার যে একটা পার্থক্য আছে তা আদৌ আমরা জানি কি না।
প্রথম কথা দেশ জিনিসটা ইমপোসড… পলিটিক্যাল বা হিস্টোরিক্যালভাবে মহান বা অমহানভাবে সৃষ্টি, যাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টির ইতিহাসকে মহান বানানো জরুরি। আর জাতি জিনিসটা ন্যাচারাল। একই অঞ্চলের কিছু মানুষ একই ভাষায় কথা বললে, একই খাবার খেলে, একই কাপড় পরলে, একই উৎসব পালন করলে আমরা তাকে বলি জাতি। দেশ হতে হলে কি এক জাতি হতে হয়? নট ন্যাসেসারিলি… এক দেশে বহু জাতি থাকতেই পারে। তবে তাদের কমন ইন্টারেস্টটা একটু মজবুত হওয়া লাগে। নইলে একসাথে থাকবেই বা কেন? তবে এক জাতি দুই দেশে… চিন্তার বিষয় !!!
১৭৭৬ এর আগের সময়টা একটু ভাবি। নর্থ আমেরিকা বড় একটা মহাদেশের বড় একটা জায়গা জুড়ে ছোট ছোট ভাগে ভাগ হওয়া অঞ্চল চালাচ্ছে ব্রিটিশ রাজ ! এই ছোট ছোট অঞ্চলের মানুষগুলো কি একই জাতি? যথেষ্ট সন্দেহ এদের একচুয়েল জাতিটা কি ! এদের ভাষা কি একই? যথেষ্ট সন্দেহ একচুয়েল ভাষাটা কি? ব্রিটিশ রাজদের সাথে থেকে পৃথিবীর বহু জাতির মিশ্রনে কমন ভাষা ব্যাবহার করে। এদের কালচার কি একই? এরা কি পাশের অঞ্চলকে নিজের মতো মনে করে? না… না… কিচ্ছু না… উত্তর হচ্ছে না ! তাহলে এদের কমন ইন্টারেস্টটা কি? কি তাদের একতা নির্ধারণ করে? ঠিক কোন ফোরস এতো বড় একটা অঞ্চলের একেকটা ভিন্ন ভিন্ন দেশের মতো খন্ডকে একটা দেশ বানানোর আইডিয়া দেয়? ব্রিটিশ শাসন !!! হ্যাঁ সত্যি কথা।

[নিচের বিজ্ঞাপনটিতে ক্লিক করুন]



এই এতো বড় অঞ্চলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশরূপ অঞ্চলের একমাত্র কমন ইন্টারেস্ট ব্রিটিশরা তাদের অত্যাচার করেছে। তাদের একসাথে আন্দোলন করার এজেন্ডা কই? ঠিক কোন পয়েন্টে আন্দোলন করে স্বাধীন হবে? সবচেয়ে মজার কথা সময়ের দিকে লক্ষ করলেই দেখবো তার দশক নাগাদ আগে আমাদের পলাশীর যুদ্ধ হয়েছিল। ব্রিটিশরা পুরা জান লাগায় দিসে এইখানে। ফলে তাদের টাকা নিয়ে টানাটানি। এইদিকে টাকা ঢালবে উদ্ধার করবে ওইদিন থেকে। আকাশপাতাল ট্যাক্স বাড়ায়ে দিল। এবং এই ট্যাক্স নিয়ে আন্দোলনই কিন্তু এমেরিকান রেভ্যুলুশানের প্রধান এজেন্ডা ! আর এখানে তাদের বিপ্লব কতোটা আর ইন্ডিয়া দখলের পর নর্থ এমেরিকা চালানোর অক্ষমতা কতোটা স্বাধিনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছিল তা আসলেই ডিবেটেবল! মজার বিষয় না? আমরা ওইদিকে মারা খাইলাম দেখে এরা স্বাধীন হয়ে গেল? যাক সেসব… এমিরিকাকে জিনিয়াস বলার পয়েন্ট এখানেই। কঠিন কোনো এজেন্ডা বা সহজ কোনো জাতীয়তাবোধ না থেকেও এরা একটা দেশ বানাতে পেরেছে… এতো বড়! সিরিয়াসলি… এতো বড় ! ! ! কেন? কারণ তাদের দূরদর্শিতা।

অসাধারণ ফাউন্ডিং ফাদারদের অসাধারণ দূরদর্শিতা। একটা দেশ বড় হইলে তার আর কি কিছু লাগে? এমেরিকার কন্সটিটিউশান বানানোর সময় তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভাই মোনারকি আমাদের মা বেহেন করে দিসে তাই এমন একটা ব্যবস্থা বানাতে হবে যাতে কোনো ইন্ডিভিজুয়ালের হাতে পাওয়ার না থাকে। ইভেন এখনো এম্রিকার পলিটিক্যাল সিস্টেম আমার অসাধারণ লাগে। গণতন্ত্রের যেমন দরকার আছে তেমন গ্ণতন্ত্রেরও গলদ আছে। এমেরিকার পলিটিক্যাল সিস্টেম দরকার এবং গলদকে একসাথে কভার করেছে সম্ভবত পৃথিবীর সবচে ইফেক্টিভভাবে। (সেটা নিয়ে কেও আলোচনা করতে চাইলে কমেন্টে বলুন। আলাদা পোস্ট করবো নিশ্চই)। আচ্ছা ফেরত যাই ৭৬ এ… আল্টিমেট পাওয়ার এড়াতে তারা স্টেট গভমেন্ট (সেই ছোট ছোট অঞ্চল), আর ফেডারেল গভমেন্ট কনসেপ্ট আনলো। এবং প্রথম কনস্টিটিউশান (আরটিক্যাল অফ কনফেডারেশান) এ যেই জিনিসটি সবচে বেশি গুরুত্ব পেল সেটি হলো সেপারেশান অফ পাওয়ার। যেখানে স্টেটগুলার আলাদাভাবে সার্বভৌমত্ব থাকবে, খালি একটা সেন্ট্রাল ফোরস থাকবে পুরা জায়গাটাকে টিকায় রাখার জন্য। মানে বুচ্ছেন… মানে এদের একসাথে দেশ বানানোর ইচ্ছা, দরকার, ভালোবাসা, বিশ্বাস কিছুই নাই। নাই তেমন কোনো বিপ্লবী চেতনা। তাইলে এই ভাঙ্গাভুঙ্গা অঞ্চলগুলা একটা দেশ হয়ে ২৫০ বছর পৃথিবিতে আছে কেমনে? আছে তো আছে… ছড়ি ঘুরাচ্ছে কেমনে? এতো বড় দেশের যেখানে তার মানচিত্রই বলে দেয় এই জায়গার মানুষ এই জায়গা থেকে আলাদা… এই জায়গায় রিপ্রেজেন্টেটিভ বেশি এই জায়গায় কম… এই দেশ টিকে আছে কেমনে? এরা কি আলাদা হওইয়ার চেষ্টা করে নাই সিভিল ওয়ার করে? স্লেভারির ইস্যুতে তারা কি রক্তারক্তি মতভেদ সৃষ্টি করে নাই? করেছে। কিন্তু জাতীয় নেতাদের দূরদর্শিতা, অতি মহান হওয়া থেকে বিরত থাকা, নিজেকে একক জাতীয় নেতা হিসেবে দেখতে চাওয়ার জন্য গাধা ডিসিশান না নেয়ার কারণে আজকের এমেরিকা। যার আলাদা আলাদা স্টেটগুলা আসলেই এখন নিজেদের একটা দেশ মনে করে। এই দেশের সৃষ্টি যে রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচে দূরদর্শী ঘটনাগুলার একটা যা কি না চূড়ান্তভাবে সফল তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই !!!

এতো ইতিহাস লিখার কারণে বহুত পেইন খাইসেন। কিন্তু এতোটুকু না বললেই নয়। কারন ভারতীয় উপমহাদেশের কাহিনী আমরা সবাই জানি কিন্তু এমেরিকারটা কদ্দুর জানি কে জানে! এখন দেখাই ‘৪৭ এ ভারতের এবং ‘৭১ এ বাংলাদেশ- পাকিস্তানের চিত্র। নামটা খেয়াল করেন- ভারতীয় উপমহাদেশ… ৫০০০ বছরের পুরানো সভ্যতা। এক জাতি, এক খাবার। ভাষাগত কিছু পার্থক্য আছে কিন্তু গোড়াটা একই। ধর্ম নিয়ে যাদের চেঁচামেচি করার জন্য এখনি ফাল পারতে মন চাচ্ছে তাদের বলি এখতেয়ার উদ্দিন ১২০০ এর দিকে আসচিলেন এ অঞ্চলে। তখন থেকে ১৮০০ পর্যন্ত ছয়শ বছরে কোনো মেজর ঘটনাই নাই। এবং আপনি যে ফালটা পারতে চাচ্ছেন এটা হইলো ১৮০০ সালে পাতা ২০১৫ সালের তরুনের জন্য ফাঁদ (এটা বড়ই দূরদর্শী ফাঁদ ) এই জাতি ব্রিটিশ শাসনের সময় বেকুবশ্রেষ্ঠের মতো আচরণ করলো। একটা করে টোপ ফেলল আর তারা গিলল। সাধারণ মানুষ কতোটা গিলল আমি জানি না। আমি জানি দেশ ভাগের সময় সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা। একটা ম্যুভির ট্রেইলারে দেখলাম ‘৪৭ নিয়ে, ‘Where freedom will fight independence’ । অনেক অসাধারণ কথা! আরবিট্রারিলি দেশ ভাগ করে ফেললো ৫০০০ হাজার বছরের পুরানো সভ্যতার ম্যাপের মধ্যে আঁকিবুকি করে। মানুষ তেমন চাইলো না। তাহলে কেমনে পারলো? আমাদের আহাম্মক নেতাদের কারণে। এক জঙ্গলে দুই বাঘ থাকতে চায় না। জিন্নাহ জাতীয় নেতা হইতে চায়। ব্যাস ভাগ করো ! (আমি মোটেও বুঝাইতে চাই নাই জিন্নাহ একক দায়ী। আমি বুঝাইতে চাইসি ভাগটা সামাজিক থেকে অনেক বেশি রাজনৈতিক) তারপর আসলো ‘৭১। দেশ চালাইতে সেস্রামি করা যাকে বলে তাই করলো পাকিস্তান। দেশের অর্ধেক ভাগকে কম দেয়া, মাইরা খাওয়া ইত্যাদি হলো শ্রেষ্ঠ পলিটিক্যাল সেস্রামি। এবং শ্রেষ্ঠ বেকুবামি হইলো যেই জাতিটা আলাদা হই হই ভাবে আসে সেই জাতির উপর ২৫ শে মার্চ হানা !!! চিন্তা করা যায় বেকুবামির লেভেল? আর সৃষ্টি হইলো বাংলাদেশ। খুবি ছোট্ট, ইমোশনাল, সুন্দর আর স্বপ্নময় দেশ। যারা সারাজীবন মারা খাইসে।
আমার এতো বড় পলিটিক্যাল ইতিহাস ফান্দার কারণে আপনারা হয়ত ভুলেই গেসেন আমি শুরু করসিলাম কি দিয়ে আরপ্রমাণই বা কি করতে চাইসিলাম। আমি শুরু করসিলাম যে আমরা মারা খাই কারণ আমরা গাধা আর আম্রিকা থ্রাইভ করতেসে কারণ এরা জিনিয়াস। তাইতো ওরা ইউনাইটেড স্টেটস অফ এমেরিকা (এমেরিকা অঞ্চলের একতাবদ্ধ স্টেট সমগ্র। একটা সুন্দর নাম পর্যন্ত নাই দেশটার, দেশাত্ববোধ তো দূরের কথা। তারা আজকে সবচে সফল দেশ !) আর আমরা ৫০০০ বছরের বৃহত্তর ভারতবর্ষ যারা টুকরা টুকরা হয়ে একাকার। ভারতবর্ষের তিন টুকরার মধ্যে ভারতই এখন এগিয়ে যাচ্ছে কারণ তার বড় ভুখন্ড। একটা বড় ভুখন্ড থাকলে আর কিচ্ছু লাগে না ট্রাস্ট মি। আর আমার সোনার বাংলা খেটে মরে দূর দূর করে আগাচ্ছে… (টাকা আর রূপীর কনভারশান রেটটা দেখলেই বুঝবেন) কিন্তু কদ্দুর পারবে কে জানে এই অল্প জায়গা নিয়ে। আর মজার বিষয় হলো বাংলাদেশ – ইন্ডিয়া – পাকিস্তান এই দেশগুলো একে অপরকে যেভাবে ঘৃণা করে তাতে বলতে হবে ব্রিটিশ রাজের দূরদর্শিতা আমাদের ৫০০০ বছরের অহংকারকে মাটি করে দিতে যথেষ্ট ছিল। আফ্রিকান কলোনাইজড দেশ যেগুলো পরবর্তীতে টুকরো টুকরো স্বাধিনতা পেয়েছে তারা কিন্তু ভিন্ন দেশে বাস করলেও আদতে একে অপর থেকে ভিন্ন মনে করে না। কারণ ডিভাইড এন্ড রুল করতে ধর্মের চেয়ে ভালো হাতিয়ার হয়ত নেই। আর সাথে যদি আহাম্মক কিছু নেতা থাকে তাহলে আর কি লাগে!

রিভানা শরফুদ্দিন

রিভানা শরফুদ্দিন

‘ফেসবুক কর্ণার এ প্রকাশিত লেখা প্রয়োজন২৪ এর নিজস্ব প্রতিবেদন নয়, ফেসবুক ব্যাবহার কারীদের মতামত।’

Share Button