,

অবহেলা সইতে না পেরে কুকুরের আত্মহত্যা, পড়ুন হৃদয় বিদারক গল্প

dog collage



।।রাকিবুল হক এমিল।।

যারা শখের বশে কুকুর কিনে, এখন তাকে ফেলে রেখেছেন বাড়ির সবচেয়ে অবহেলিত কোনে- তাঁদের জন্য!!!
এড়িয়ে যাবেন না দয়া করে, হয়তো আপনার দৃষ্টি ভঙ্গিই বদলে যাবে।

এক গুচ্ছ অভিমান,একটি আত্মহত্যা ও বিপন্ন মানবতা…

শখ করে কেউ একজন নাম দিয়েছিল ডাস্টিন। শখ করেই এনেছিল ওকে। বেশ নামি-দামি জাতের কুকুর সে- জার্মান শেফার্ড ।
যবে থেকে এই বাসায় এলো, প্রথম হয়ত ঠাই হয়েছিল বাসার মানুষগুলোর সাথেই। কিন্তু শখের বশে মানুষগুলো কুকুরটিকে কিনে আনলেও, সাংস্কৃতিক ভাবে, কুকুরের সঙ্গ নেবার মত চর্চা ধারন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত এদেশের আরও অনেক জার্মান শেফার্ডের মতই তার স্থান হয় বাড়ির ছাদে। যে ছাদ বাড়ির সবাইকে ছায়া দেয়, বৃষ্টি থেকে বাঁচায়, আশ্রয় দেয়…সেই ছাদ।
কিন্তু ডাস্টিনের মাথার উপর কোন ছাদ ছিল না। বৃষ্টি, ঝড়, রোদের খরতাপ, শীতের সুঁই বেঁধানো বাতাস তার ছোট জীবনকে দুর্বিষহ, অসহনীয় করে তুলছিল…বৃষ্টি যখন শুরু হত, সে ছাদের উপর ছুঁটোছুঁটি করতো, তার মাথার উপর এক টুকরো ছাদের জন্য। মাথা কুটে মরেও একটু আশ্রয় মিলত না। বৃষ্টির ফোঁটার আঘাত স্বীকার করে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। তার মানুষ “মালিকেরা” কদাচিৎ তাকে দেখতে আসতো। মনে হলে খাবার দিত, মনে না হলে সে না খেয়েই থাকত।
মাঝে একবার তাকে দিয়ে সন্তান জন্ম দেয়া হল। সেই ডাস্টিন ভেবেছিল, আহা এবার অন্তত সন্তানদের নিয়ে সময় পার করা যাবে। মানুষ তাকে ছুঁড়ে ফেলেছে তো কি, তার সন্তানরাই থাকবে তার সাথে।
মাস খানেকের মাঝেই তার সন্তানেরা বিক্রি হয়ে কোথায় যে চলে গেল… ডাস্টিন জানে না। জানে শুধু ছাদ থেকে নিচের ঐ পথ দিয়েই ওদের নিয়ে গিয়েছে। সেও একদিন ওই পথেই এসেছিল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সেই পথে। মাঝে মাঝে কাউ কে দেখলে ডাকতো- “আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে। আমি মুক্ত আকাশের নিচে বন্দি”।
ডাস্টিনের জীবনের একমাত্র আনন্দের মুহূর্ত ছিল পাশের ছাদের কিছু মানুষ Laverne Atkinson । মেলাতে পারেনা ডাস্টিন এই মানুষদের সাথে তার “মালিক” মানুষদের। সে ভাবতো- “ তার মত সব কুকুরই তো মানুষকে পরম ভালবাসে। সব কুকুর এক রকম। কিন্তু এই মানুষেরা এক জন থেকে আরেকজন এত ভিন্ন কেন”?
যাইহোক, অন্তত পাশের ছাদের এই মানুষ গুলো তার সাথে কথা বলত, খুব যখন ক্ষুধা পেত, এরা তাকে খেতেও দিত। এই মানুষগুলো তার “মালিক” কে কত বুঝাল একদিন- তাকে একটু যত্নে রাখতে, একটা ছাদ দিতে… যেন সেও রোদ, ঝড়, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারে। কিন্তু তার মালিক কেন যে সব কথা এড়িয়ে যেত, ডাস্টিন মেলাতে পারেনা।
ডাস্টিন তার জীবনের কোন হিসেবই আর মেলাতে পারেনা। ওহ…অসহ্য হয়ে উঠছে সব কিছু। ছাদহীন এই ছাদ যেন নরক হয়ে উঠেছে আজ-কাল। সন্তানদের নরম পায়ের ধাক্কা এখনো বুকে অনুভূত হয়… বুকের ভিতরটা খাঁ খাঁ করে উঠছে।
পাশের ছাদের মানুষটি কোথায়? বিদায় নেবার সময় হয়েছে… তাকে একবার দেখে যেতে হবে- জানিয়ে যেতে হবে আমার এই নরক যন্ত্রণার একমাত্র সাক্ষী সেই। হে মানুষ- তুমি জানিয়ে দিও তোমার সব মানুষ বন্ধুদের… ডাস্টিন একটি যন্ত্রণাকাঁতর হৃদয়। একটি আত্মা, ডাস্টিন কোন শেফার্ড নয়, কোন কুকুর নয়, একটি আত্মা। এই আত্মা তার শরীরের সমস্ত যন্ত্রণার অবসান ঘটাবে আজ। ছাদের নিচের ঐ মুক্তির পথে সে-যে করেই হোক যাবে। বিদায় বন্ধু। গত পাঁচ বছর ধরে আমার এই যন্ত্রণা তোমাকেও ভীষণ পীড়িত করেছে আমি জানি। তুমিও প্রশান্ত হবে আজ।



বিদায়…
পাঁচটি বছর ভীষণ একাকিত্ব এবং মানসিক চাপ নিয়ে ডাস্টিন এই ছাদে বসবাস করে। একি রকম যন্ত্রণার দিন গুলো শেষ হয়নি তার। মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ছাদ থেকে দেখতে পাওয়া নিচের পথটিই বেঁছে নেয় সে…আর সব হেঁটে যাওয়া মানুষ, কুকুরের মতই সেও হেঁটে যেতে চায় মুক্ত পৃথিবীতে। ৮ই আগস্ট, ২০১৫। ডাস্টিন আত্মাহুতি দেয়। কুকুর বলেই হয়তো তার মালিকদের নিপীড়নের গল্প গুলো সে লিখে যেতে পারেনি। কিন্তু, আমরা মানুষ, আমরাই ডাস্টিনের কণ্ঠ।
শুধু খাবার আর থাকার জায়গা পেলেই কুকুর ভাল থাকে একথা যারা ভাবছেন, তারা মোটেও সঠিক নন। আদিকাল থেকেই কুকুর মানুষের সাহচর্যে বেড়ে উঠা প্রাণী। আপনি তাকে সঙ্গ দিতে না পারলে, অহেতুক শখের বশে অথবা উচ্চ বর্গের সামাজিক অবস্থান প্রকাশ করতে ওদের কিনে এনে দেয়ালের কোনে, ছাদে অথবা অন্ধকার গ্যারেজে বেঁধে বা ফেলে রাখবেন না। তার প্রতিটি নিঃশ্বাস আপনার অন্য পৃথিবীকে অন্ধকারাছন্ন করে ফেলবে হয়ত বা।

11201815_10153477107097787_7884618422341580573_n

রাকিবুল হক এমিল
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য- পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার। ১১ অগাস্ট, ২০১৫।

‘ফেসবুক কর্ণার এ প্রকাশিত লেখা প্রয়োজন২৪ এর নিজস্ব প্রতিবেদন নয়, ফেসবুক ব্যাবহার কারীদের মতামত।’

Share Button